আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারে আ’লীগ

70

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারে আ’লীগ

Bangladesh Awami League - বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায় সরকার। সে লক্ষে নানা তৎপরতা শুরু করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। তারই অংশ হিসেবে প্রভাবশালী দেশগুলো সফর করছেন দল ও সরকারের প্রতিনিধিরা। এসব সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুর সাথে চলমান রাজনীতি ও আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গ বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, সরকারবিরোধী জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং সরকারের দমনপীড়নের মুখে দেশের রাজনীতিতে একধরনের গুমোট অবস্থা বিরাজ করছে। বিরোধীদের আদালতের বারান্দায় ব্যস্ত রেখে রাজনীতির মাঠ নিজেদের দখলে রেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত রেখে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায় সরকার। তবে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে বিরোধীরা আপাতত কোণঠাসা হলেও আগামী নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।

খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তৎপর হয়ে উঠেছে বলে সরকারের কাছে খবর রয়েছে। সে জন্য বিএনপিকে দমনের সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও ম্যানেজ করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সাথে বৈঠক ও যোগাযোগ রক্ষা এবং বিদেশে সভা-সেমিনারে দল ও সরকারের প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক আরো উষ্ণ করার কৌশল নেয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে আওয়ামী লীগ। সেই লক্ষ্যে যা কিছু করার সবই করছে সরকার। তবে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক আরো বেশি মজবুত করতে চায় সরকার। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারত, উন্নয়ন অংশীদার চীন এবং রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ প্রভাবশালী দেশগুলো টার্গেট করে এগোচ্ছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এ মাসেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া সফর করবেন। অপর দিকে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির আমন্ত্রণে ২১ এপ্রিল ভারত সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে আওয়ামী লীগের বড় একটি প্রতিনিধিদলের। দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ দলের নেতৃত্ব দেবেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এবং পররাষ্ট্রসচিব বিজয় কেশব গোখলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এই প্রতিনিধিদল। সফরটি মার্চের ১১ তারিখে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের তারিখ ঠিক করতে না পারায় এই সফর পিছিয়ে ২১-২৭ এপ্রিলে নেয়া হয়েছে।

সূত্রগুলো আরো জানায়, বিজেপির আমন্ত্রণে আওয়ামী লীগ নেতারা ভারত সফরে গেলেও এ সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিবেশী এই প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করা। এ সফরে খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গ স্থান পেতে পারে। এ সফরের জন্য ইতোমধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনে ২০ নেতার একটি তালিকা পাঠিয়েছে আওয়ামী লীগ। ওবায়দুল কাদের ছাড়াও ওই প্রতিনিধিদলে রয়েছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বাহাউদ্দিন নাছিম, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, মিছবাহউদ্দিন সিরাজ, এনামুল হক শামীম ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, কেন্দ্রীয় সদস্য মির্জা আজম প্রমুখ।

এর আগে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির আমন্ত্রণে গত ১৭ ও ১৮ মার্চ ভারত সফর করে আওয়ামী লীগের তিন সদস্যদের প্রতিনিধিদল। এ দলে ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা: দীপু মনি ও উপদফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। সেখানে তারা কংগ্রেসের নতুন সভাপতি রাহুল গান্ধী ও তার মা সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দলের দায়িত্ব নেয়ার পর রাহুল গান্ধীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদলের এটিই ছিল প্রথম সাক্ষাৎ। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে চীন সফর করে। এ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব:) ফারুক খান এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা: দীপু মনি। প্রতিনিধিদলে আরো ছিলেন দলের আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ, আইন সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সবুর, মহিলা ও শিশুবিষয়ক সম্পাদক ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক শামসুর নাহার চাপা, উপদফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, কার্যনির্বাহী সদস্য দীপঙ্কর তালুকদার, পারভীন জাহান কল্পনা, অ্যাডভোকেট রিয়াজুল কবির কাওসার, মেরিন জাহান, বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও উপাধ্যক্ষ রেমন্ড আরেং।
চীন সফরে যাওয়ার আগে মনোনীত প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
আওয়ামী লীগের সিনিয়র কয়েকজন নেতা জানান, কূটনেতিক সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এর মাধ্যমে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের কারণে সৃষ্ট দূরত্ব ঘোচাতে চান তারা। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ইস্যুকে একটি বড় ধরনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছেÑ যা ইতোমধ্যে বিশ্বসম্প্রদায়ের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের দু’জন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে তুরস্কসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্কের অবনতি হয়। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে সেই সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তুরস্কের ফার্স্টলেডি রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে বাংলাদেশে সফরে এসে বর্তমান সরকারের প্রশংসা করেছেন। তুরস্কের রাষ্ট্রপতিও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাথে ফোনে আলাপ করে পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া পুরো মুসলিম বিশ্ব ত্রাণতৎপরতা ছাড়াও এখন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশও সরকারের পাশে রয়েছে।
এক কথায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে দু-একটি দেশ ছাড়া প্রায় পুরো বিশ্ব শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছে। শেখ হাসিনাকে মানবিক নেত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করছেন কেউ কেউ। আর এ সুযোগ কাজে লাগাতে চায় সরকার। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এ সমর্থন ধরে রাখতে চান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। সে জন্য বিদেশসফর ও নিয়মিত যোগাযোগসহ নানা ধরনের কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও মানবিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে উন্নয়নের রোলমডেল। উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর হওয়ায় বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বিভিন্ন দেশ বা সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। অনেক দেশ আজ বাংলাদেশের কাছে শিখতে চায়। উন্নয়নের গল্পটা শুনতে চায়।

দলের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা বিশ্বে আজ মানবিক নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার নেতৃত্ব ও মানবিকতার প্রশংসায় আজ পুরো বিশ্ব পঞ্চমুখ। আন্তর্জাতিকভাবে এ ইমেজ আমরা আগামীতেও ধরে রাখতে চাই। তবে নির্বাচন হচ্ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আওয়ামী লীগ সরকার অবশ্যই একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। নির্বাচন নিয়ে বিদেশীদের কোনো হস্তক্ষেপ আমরা কখনো কামনা করিনি এবং ভবিষ্যতেও করব না।

দলটির আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ বলেন, কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সাথে বিভিন্ন দেশের যে সুসম্পর্ক আছে, এই সফরগুলো তারই প্রমাণ।