[৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ ভোররাতে বিএনপি চেয়ারপার্সন  বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এর আগে তাঁকে বিদেশে পাঠানোর জন্য নানাবিধ চাপ প্রয়োগ করা হয়।গ্রেফতারের পর আদালতে হাজির করলে বেগম খালেদা জিয়া যে বক্তৃতা দেন তা পরের দিন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়। ৪ সেপ্টেম্বর ২০০৭ দৈনিক আমার দেশ-এ প্রকাশিত সেই বক্তৃতাটি তুলে ধরা হলো]

বাংলাদেশকে নিয়ে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। এ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই বিএনপি ভাঙার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে এবং আমাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে আমাকে দেশ থেকে বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। এখন আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি বাইরে চলে গেলে আজ আমাকে এভাবে গ্রেফতার হতে হতো না। আমি বলতে চাই, এই দেশের মাটি ছাড়া আমি এবং আমার পরিবারের কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশ আমার ঠিকানা, এই দেশেই আমি মরব। গ্রেফতারের পর গতকাল সকালে ঢাকা সিএমএম কোর্টে হাজির করা হলে আইনজীবীদের বক্তব্যের পর কোর্টের অনুমতি নিয়ে তিনি ৮টা ২৫ মিনিটে বক্তৃতা দিতে দাঁড়ান।        কোর্টে ১২ মিনিটব্যাপী মর্মস্পর্শী বক্তৃতা দেন তিনি। এ সময় কোর্টে ছিল পিনপতন নীরবতা। বেগম খালেদা জিয়া বলেন, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে এ মামলা করা হয়েছে। এই মামলা ষড়যন্ত্রের মামলা। অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, বিএনপি পাঁচবার এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। বাংলাদেশের উন্নয়ন আর কল্যাণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, আমার ও বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এ দেশের জন্য আমরা নিবেদিতভাবে কাজ করেছি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার, আমাদের পরিবারের বা আমার ছেলেদের অর্থের কোনো লোভ নেই, অর্থের কোনো প্রয়োজন নেই। এ দেশের জনগণের ভালোবাসা এবং সমর্থন আমরা সবসময় পেয়েছি এবং পাচ্ছি। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমরা সবসময় দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছি। তিনি তার ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করার আহবান জানিয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। বেগম জিয়া বলেন, আমার প্রিয় দেশবাসীকে বিনীতভাবে জানাতে চাই, আমি এবং আমার পরিবার সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ। মহামান্য আদালতকে সবিনয়ে জানাতে চাই, আমরা সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাই এই মিথ্যা মামলা থেকে সুবিচার চাই। শুধু আমি নই, যে কোনো নেতা-নেত্রীর বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হোক। ভোরে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে গ্রেফতারের পর সকাল সোয়া ৮টায় বেগম খালেদা জিয়াকে কোর্টে আনা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট এবিএম ফাত্তার আদালতে আনার পর কোর্টের অনুমতি নিয়ে তাকে চেয়ারে বসতে দেয়া হয়। এ সময় তিনি ছিলেন স্থির, ধীর। তাকে কোনো প্রকার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হয়নি। চোখের চশমা খুলে তিনি ভ্যানিটি ব্যাগে রাখেন। আদালতের কাজ শুরু হলে এসি প্রসিকিউশন প্রথমেই এফআইআর পড়ে শোনান। এফআইআর-এর অভিযোগগুলো যে ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা, তার অভিব্যক্তি তিনি আইনজীবীদের কাছে প্রকাশ করেন। এরপর একে একে আইনজীবীরা মামলার অসারতা তুলে ধরেন আদালতে। আইনজীবীদের বক্তব্য শেষ হলে কোর্টের অনুমতি নিয়ে তিনি বক্তৃতা দিতে ওঠেন। এ সময় তাকে অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয়ী দেখাচ্ছিল। তিনি মর্মস্পর্শী বর্ণনায় দেশ-জাতির কল্যাণে তার কাজ, দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। কোর্টে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, মাননীয় আদালত, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে এ দেশের প্রতিটি মানুষই চেনে। তিনি স্বাধীনতার ঘোষকই শুধু ছিলেন না, সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষকের স্ত্রী হিসেবে আমি বলতে চাই, এ দেশের উন্নয়নে তার অবদান অপরিসীম। এ দেশের যত উন্নয়ন ও কল্যাণ হয়েছে, তা শহীদ জিয়া ও জাতীয়তাবাদী দলের মাধ্যমে হয়েছে। তিনি তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ থেকে মুক্ত করে, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করেছেন। তার সময় বাংলাদেশ থেকে চাল রফতানি পর্যন্ত হয়েছে। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে গোটা মুসলিম উম্মাহসহ বিদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।                  তিনি বেঁচে থাকলে এ দেশের আরো উন্নতি হতো। তিনি দেশকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত করেছিলেন। সেই চেতনার আলোকে দেশের কৃষক-শ্রমিক-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ দেশের সমৃদ্ধি ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাকে নির্মম হত্যার শিকার হতে হয়। তার শাহাদতের পর কুচক্রীরা ভেবেছিল তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি আর থাকবে না। এ দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করা যাবে, কিন্তু জনগণ পরবর্তী সময়ে এই ষড়যন্ত্র ভণ্ডুল করে দেয়।এ প্রসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, আমি রাজনীতিতে আসতে চাইনি। কিন্তু জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর এ দেশের মা, বোন ও ছাত্র-জনতা, এ দেশের স্বার্থে, বিএনপির স্বার্থে আমাকে রাজনীতিতে আসতে উদ্বুদ্ধ করে। দেশের কথা ভেবে, দলের কথা ভেবে এবং লাখো কোটি মানুষের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমি রাজনীতিতে আসি। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সংগ্রামে অবতীর্ণ হই। গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলি। তখনো আমাকে কয়েকবার হাউস এরেস্ট করা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলন থেকে আমি পিছপা হইনি। সেদিন জনগণের সমর্থন নিয়ে আমরা আন্দোলন সফল করেছিলাম এবং স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিলাম। স্বৈরশাসন অবসানের পর সবাই মিলে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার প্রধান মনোনীত করি। তার অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে আমার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বিজয় লাভ করে।     ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সরকার পরিচালনা করে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন করতে আমরা সক্ষম হই। একইভাবে পরবর্তী সময়ে সরকারে এসেও উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিয়ে যাই। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, এ দেশের যত উন্নয়ন হয়েছে তার বেশিরভাগই জিয়াউর রহমান, আমি এবং বিএনপির অবদান। আমি বাংলাদেশের যত জায়গায় গিয়েছি আর কেউ সম্ভবত এ জায়গায় যাননি।  তিনি আরো বলেন, আমি আজ একটি কথা বলতে চাই, এ দেশের কাজ করতে গিয়ে আমার দুটি পা পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে গেছে। আমার মানুষের অর্থের প্রতি কোনো লোভ নেই, অর্থের কোনো প্রয়োজন নেই। আমি কাউকেই প্রভাবিত করিনি, আমাকেও কেউ প্রভাবিত করেনি। আমরা সবসময় দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে এসেছি এবং যতদিন বেঁচে থাকব, এ দেশের কল্যাণেই নিজেকে নিবেদিত রাখব।

 
প্রকাশক: সালেহ মোহাম্মদ রশীদ অলক
সম্পাদকঃ মাহসাব হোসাইন রনি
বার্তাকক্ষঃ ০১৭১১-৪৬০৬০১ | ই-মেইলঃ news.politicsnews24@gmail.com
 
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি