শক্তিশালী ও সুসংহত অবস্থানে খালেদার চেয়ে অনেক এগিয়ে শেখ হাসিনা: আইআরআই

37

২০১৭ সালের গ্রীষ্মে ওয়াশিংটন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইন্সটিটিউটের (আইআরআই) পরিচালিত কয়েক দফা ফোকাস গ্রুপ ডিসকাসনের (এফজিডি) মাধ্যমে এই বিষয়েটি উঠে এসেছে যে- বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) ও তার চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুসংহত অবস্থানে রয়েছে।

আইআরআই এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এফজিডি’র ফলাফল প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ প্রাত্যহিক চ্যালেঞ্জ: অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্ত বিষয়ক জনমত জরিপ শিরোনামের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই দেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং বর্তমান উন্নতি ও অগ্রগতির ধারার জন্য আওয়ামী লীগ ও এর সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।আইআরআই বলছে, ব্যক্তি শেখ হাসিনার বিপুল জনপ্রিয়তা এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অর্জনের জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে বেশ শক্ত অবস্থানে থেকে ২০১৮ সালের নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

আলোচনায় উঠে আসা এই বিষয়কে আইআরআই ব্যাখ্যা করেছে এভাবে: ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনার ওপর বাংলাদেশের মানুষের দৃঢ় আস্থা ও অবিচল সমর্থন রয়েছে। পরিকল্পিত স্থানীয় উন্নয়ন এবং শেখ হাসিনা ও তার রাজনৈতিক দলের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এখানে প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে…।’

নারীর অধিকার বাস্তবায়নে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে শেখ হাসিনা যেভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এর পাশাপাশি বিশেষ করে শিক্ষার উন্নত মান আর নেতৃত্বের জন্যও শেখ হাসিনার প্রশংসা হয় এসব আলোচনায়।শেখ হাসিনার প্রতি ইতিবাচক এমন অনেক মন্তব্য ওই প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। যার মধ্যে খুলনার একজন ব্যক্তি বলেন, ‘আমি যখন তার (শেখ হাসিনা) কথা স্মরণ করি, তখন আমার দেশের উন্নয়নের কথা মনে হয়।’

শেখ হাসিনার সম্পর্কে ওই আলোচনায় ময়মনসিংহের এক নারী বলেন, ‘গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ান বলে তাকে আমি পছন্দ করি।’ ময়মনসিংহের আরেকজন নারী বলেন, ‘শেখ হাসিনা মানেই বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুমানেই স্বাধীনতা যুদ্ধ।’অপরদিকে, বিএনপি এবং এর চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং জামায়াতে ইসলামের প্রতি অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীরাই নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন এসব আলোচনায়। সহিংসতা, মৌলবাদ এবং ধর্মীয় চরমপন্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় বিএনপি এবং এর জোটের অন্যতম সঙ্গী জামায়াত ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে অনেক কাঠ খর পোড়াতে হবে, এমন মত দিয়েছেন অনেকেই।

তবে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ইতিবাচক সমালোচনা পেয়েছে এসব এফজিডিতে।এই পরিপ্রেক্ষিতকে আইআরআই ব্যাখ্যা করেছে এভাবে: ‘জাতীয় পার্টি (জাপা) বাদে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অসংখ্য নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য জড়িয়ে রয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে দেশব্যাপী জ্বালাও-পোড়াওয়ের কারণে বিএনপি নিজেদের গায়ে আলকাতরা মাখিয়েছে, এমন মতও পাওয়া গেছে এফজিডিতে।

রিপোর্টে বলা হয়, বিএনপির জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জর বিষয় হচ্ছে দলটির চেয়ারপারসন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে প্রচুর সমালোচিত হয়েছেন। পাশাপাশি দেশের নারীদের প্রতি বিরূপ মনোভাবের বিস্তার এবং ধর্মীয় উগ্র সহিংসতার সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক সখ্যতার বিষয়টি জড়িত। বিএনপিকে যার ফল গুনতে হতে পারে সামনের নির্বাচনেই।’বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জামায়াতকে সঙ্গে নেয়াটা বিএনপির জন্য বড় দুর্বলতা যা দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দুর্বলতায় চির ধরানো সম্ভব নয়, এমন মতও ছিলো প্রতিবেদনে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বেশিরভাগই ছিলো তার সন্তান তারেক রহমানকে নিয়ে, যার বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আদালতে বিভিন্ন অপরাধের প্রমাণ মিলেছে এবং যিনি এখন দলটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় খালেদা জিয়া এখন কারাগারে রয়েছেন) হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন।ঢাকার একজন বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি বিএনপি খালেদার একক কর্তৃত্বের দল, সুতরাং সেখানে গণতন্ত্রের প্রশ্নই ওঠে না।’

তারেক রহমান যে আদেশ দিবেন তা বিএনপিতে চাপ সৃষ্টি করবে, এমন মতও দেন তিনি।ময়মনসিংহের একজন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তান উচ্চ শিক্ষিত কিন্তু খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্বক কাজে নিয়োজিত।’সভায় বিএনপি নিয়ে আলোচনায় তাদের সহিংস রাজনৈতিক আন্দোলনের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সভায় খুলনার একজন নারী বলেন, ‘বিএনপির নাম শুনলেই আমি আঁতকে উঠি।’

জামায়াত প্রসঙ্গে আলোচনার অধিকাংশই ছিলো নেতিবাচক। ঢাকার একজন বলেন, ‘জামায়াতে ইসলাম- ইসলাম সম্মত নয়। তাদের কাজও ইসলাম মেনে হয় না। ইসলাম শান্তির ধর্ম, কিন্তু জামায়াত নয়।’ময়মনসিংহের একজন নারী বলেন, এখন দেশ খুব স্বাচ্ছন্দ্যে চলছে। প্রতিটি সেক্টরেই অবদান রাখছেন নারীরা। কিন্তু জামায়াত ক্ষমতায় আসলে তারা নারীদের ঘরের বাইরে বের হতে দেবে না।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় সন্ত্রাস, খুন এবং লুটপাটের পাশাপাশি মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সম্মান না দেখানোর বিষয়গুলো উল্লেখ করে আলোচকরা জামায়াতের সমালোচনা করেন। আলোচনায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং দুর্নীতির বিষয়গুলো নিয়ে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য কেউ সরকারকে দায়ী করেননি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং নির্ভয়ে সবার রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের পরিবেশ তৈরির জন্য অনেক কাজ করার রয়েছে বলেও মন্তব্য আসে ওই আলোচনায়।

আলোচকরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সমূহের আরও উন্নতি প্রত্যাশা করেন। সবাই সামনের নির্বাচনে অংশ নেবেন এমন অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন এবং নির্বাচনে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে ঐক্য এবং সহযোগিতার বিষয়ে একমত হন।এফজিডির অংশগ্রহণকারীরা এই বিষয়টি দেখিয়েছেন যে তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থার উপরে বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও সমর্থন একেবারে শূন্যের কোটায় গিয়ে ঠেকেছে। নিজেদের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অনেকেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

আইআরআই গত ২০১৭ এর ৯-২০ আগস্টের মধ্যে এই ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন (এফজিডি’স)গুলো সম্পন্ন করে। ওই আলোচনার পরিসংখ্যানে এই বিষয়টি দেখা গেছে যে দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে অধিকাংশ মানুষই সন্তুষ্ট। যাইহোক, ওই আলোচনায় বাংলাাদেশ মোকাবেলা করছে এমন চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অর্থনীতি এবং আইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সবার উপরে ছিলো।রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ে বাংলাদেশীদের বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনোভাব পরিবর্তনের বিষয়গুলো মাথায় রেখে এই ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের কাঠামো তৈরী করা হয়।