শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নৃশংসতা নিয়ে কখনও কখনও বিশ্বে তোলপাড় বা উদ্বেগ দেখা যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্বের কোনো কোনো শাসক-গোষ্ঠী বিশ্ব-সমাজের নীরবতার সুযোগে এবং কখনওবা মানবাধিকারের তথাকথিত সমর্থকদের সহায়তা নিয়েই শিশু হত্যা ও শিশু-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে। এক্ষেত্রে সৌদি রাজতান্ত্রিক সরকার, ইহুদিবাদী ইসরাইল ও বাহরাইনের রাজতান্ত্রিক সরকারের নৃশংসতা লোমহর্ষক হলেও তা নিয়ে খুব-একটা জোরালো প্রতিবাদ বা নিন্দা বিশ্ব সমাজে দেখা যাচ্ছে না।

শিশু নিপীড়ন

সম্প্রতি বর্ণবাদী ইসরাইল চলমান ইন্তিফাদা আন্দোলনে অংশ নেয়ার ‘মহা-অপরাধে’ ১১ বছরের এক বিপ্লবী ফিলিস্তিনি শিশুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। আলী আলকাম নামের এই ফিলিস্তিনি শিশু হচ্ছে এখন বিশ্বের সবচেয়ে কম-বয়সী কারাবন্দি। ইসরাইলি সেনারা তাকে বন্দি করার সময় তার হাতে ও পেটে তিনটি গুলি বিদ্ধ করে। বন্দি আলীকে দেখতে আসে তার বাবা-মা। কিন্তু তাদেরকে মাত্র বিশ মিনিট সময় দেয় ইসরাইলি সেনারা।

শত শত ফিলিস্তিনি শিশু ইসরাইলি কারাগারে বন্দি রয়েছে বলে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই শিশুদেরকে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক অবস্থায় রেখেছে দখলদার ইসরাইল। ইহুদিবাদী ইসরাইল শিশুদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার করতে অভ্যস্ত এবং শিশু বন্দীদেরকে পরীক্ষাগারের ইঁদুরের মত ব্যবহার করে বলেও শোনা গেছে।

ইসরাইলের এসব নৃশংসতা নিয়ে তেমন জোরালো প্রতিবাদ শোনা যায় না। অথচ ফিলিস্তিনি সংগ্রামীদের কারণে ইহুদিবাদী ইসরাইলের কেবল একটি শিশুরও যদি কোনো অনিচ্ছাকৃত ক্ষতি হত তাহলে তা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের নেতারাও সরব হয়ে উঠতেন এবং পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যমগুলোও নিন্দাবাদের ঝড় বইয়ে দিত।

এদিকে শিশু হত্যা ও নানা ধরনের নির্যাতন আর দমন-পীড়নের ক্ষেত্রে শিশু-ঘাতক ইসরাইলের সঙ্গে যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে বাহরাইনের রাজা খলিফা ও সৌদি রাজা সালমানের সরকার!

বাহরাইনের মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বাহরাইনের ৬৩ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। এদের মধ্যে ১৮ শিশুও রয়েছে। গেলো-বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে বাহরাইনে সরকার বিরোধী প্রতিবাদীদের ওপর দমন অভিযানের অংশ হিসেবে ১৮৮৩ জনকে বন্দি করা হয়। বন্দিদের মধ্যে ২৩৭ শিশু ও ৩৪ নারীও রয়েছে।

বাহরাইনে সরকার-বিরোধী গণজাগরণ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত  নিরাপত্তা বাহিনীর হামলায় ১৫ বাহরাইনি শিশু হত্যা করা হয়েছে এবং ১৫০০ শিশুকে বন্দি করা হয়েছে।

এদিকে রাজতান্ত্রিক সৌদি সরকারও প্রতিবেশী মুসলিম দেশ ইয়েমেনের ওপর গণহত্যা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ইয়েমেনের নিষ্পাপ শিশুরাও সৌদি সরকারের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড থেকে রেহাই পাচ্ছে না। গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার বেসামরিক ইয়েমেনি সৌদি হামলায় নিহত হয়েছে। হাজার হাজার ইয়েমেনি শিশু ও নারী হতাহত হয়েছে এইসব হামলায়। গৃহহারা হয়েছে অন্তত বিশ হাজার শিশু। দেশটির হাসপাতাল, স্কুল ও সেবামূলক নানা প্রতিষ্ঠানসহ বেসামরিক অবকাঠামোর ৮০ ভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন জানিয়েছে, বেসামরিক ইয়েমেনিদের ওপর সৌদি হামলায় দেশটির ১ হাজারেরও বেশি শিশু নিহত ও সমসংখ্যক শিশু আহত হয়েছে।

সম্প্রতি ইয়েমেনের মানবাধিকার ও উন্নয়ন কেন্দ্র জানিয়েছে, গত বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ইয়েমেনে দশ মাসের সৌদি হামলায় নিহত হয়েছে ৭ হাজার ৪১১ জন এবং আহত হয়েছে ১৩ হাজার ৮৪৬ জন। আর হতাহতদের বেশিরভাগই হল নারী ও শিশু। ইয়েমেনের ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বিচার বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে দেশটির বহু স্কুল। ফলে ইয়েমেনি শিশুদের পড়াশুনা ও শিক্ষার সুযোগ খুবই সীমিত হয়ে আসছে। আর যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য বেঁচে যাওয়া বা আহত ইয়েমেনি শিশুদের জন্য দুঃসহ স্মৃতি হয়ে বিরাজ করছে। দারিদ্র-পীড়িত ইয়েমেনের শিশুদের এক বিরাট অংশ এমনিতেই অপুষ্টির শিকার। আর এ অবস্থায় মড়ার ওপর খড়ার ঘা’র মত সৌদি হামলার ফলে এবং দেশটিতে খাদ্য, জ্বালানী আর ওষুধের মত নিত্য-প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব দেখা দেয়ায় ইয়েমেনি শিশুদের পুষ্টিহীনতাসহ নানা বঞ্চনা ও দুর্দশা বহু গুণ বেড়ে গেছে।

উল্লেখ্য, মার্কিন সরকার ও ব্রিটেনসহ পাশ্চাত্যের বহু দেশ সৌদি আরবকে প্রাণঘাতী এবং গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। এমনকি ইহুদিবাদী ইসরাইলও ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আগ্রাসনে রিয়াদকে সহায়তা দিচ্ছে। বিশ্ব-সমাজের বেশিরভাগই ইয়েমেনে সৌদি সরকারের অব্যাহত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে টু-শব্দটি পর্যন্ত করছে না। জাতিসংঘও যেন ঠুঁটো জগন্নাথের মত নির্বিকার হয়ে আছে। অবশ্য সম্প্রতি জাতিসংঘও ইয়েমেনে গুচ্ছ বা ক্লাস্টার বোমার মত নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের জন্য সৌদি আরবকে যুদ্ধ-অপরাধী হিসেবে দায়ী করা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের অর্থনৈতিক অবরোধসহ নানা ধরনের অবরোধ বজায় রয়েছে।

ওদিকে সিরিয়া ও ইরাকে সৌদি-মদদপুষ্ট ওয়াহাবি-সালাফি সন্ত্রাসীরাও বহু নিরপরাধ ব্যক্তির পাশাপাশি অনেক শিশুকেও হত্যা করেছে বলে বিভিন্ন সময়ে নানা খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি অনেক দুধের শিশুকেও তারা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।

সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো সিরিয়া ও ইরাকের শিশুদেরকে অনেক-ক্ষেত্রে মানব-ঢাল হিসেবেও ব্যবহার করছে। আইএসআইএল বা দায়েশ নামের বিদেশী মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি শিশুদেরকে দিয়ে বন্দীদের মাথা বিচ্ছিন্ন করা এবং গুলি করে হত্যা করার মত নৃশংস বহু ঘটনা ঘটাতে বাধ্য করছে। শিশুদের মগজ-ধোলাই করে তাদের নৃশংস ও চরম নিষ্ঠুর প্রকৃতির সন্ত্রাসী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এইসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে তাদেরকে দিয়ে। অতীতের ইহুদিবাদীরা তথা ইসরাইলের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নেতারাও এই একই পদ্ধতিতে ভবিষ্যৎ ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য শিশুদেরকে নৃশংস আচরণে অভ্যস্ত করার প্রশিক্ষণ দিত।

ইসলামের নামে বিভ্রান্ত ওয়াহাবি মতবাদে দীক্ষিত করতে সিরিয়া ও ইরাকে ওয়াহাবি সন্ত্রাসীদের দখলে-থাকা অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিশুদের পড়ানো হচ্ছে উগ্র-ওয়াহাবি চিন্তাধারায় অভ্যস্ত করার উপযোগী নানা বই। শিশুদেরকে ভবিষ্যতে ওয়াহাবি ধর্মমতের প্রচারক হিসেবে গড়ে তোলাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

 
প্রকাশক: সালেহ মোহাম্মদ রশীদ অলক
সম্পাদকঃ মাহসাব হোসাইন রনি
বার্তাকক্ষঃ ০১৭১১-৪৬০৬০১ | ই-মেইলঃ news.politicsnews24@gmail.com
 
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি