জমজমাট পাঁচটি হরর মুভি

163

জমজমাট পাঁচটি হরর মুভি

ছুটির সময়টুকু মুভিপ্রেমীদের কাছে পরম আরাধ্য। দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা থেকে সাময়িক এ মুক্তি দ্বার খুলে দেয় পছন্দের কাজগুলোতে সময় দেওয়ার। ছুটির দিনগুলো কাটতে পারে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়দের বাসায় বেড়িয়ে, বই পড়ে, শপিং করে, কিংবা স্রেফ ঘুমিয়ে! কিন্তু নির্ঝঞ্ঝাট এই অবসর রাঙিয়ে তুলতে দেখে নিতে পারেন একাকী বা প্রিয়জনের সান্নিধ্যে চমৎকার কিছু মুভি। রাতে আলো নিভিয়ে ছমছমে পরিবেশে ভয়াল মুভি দেখার চেয়ে চিত্তাকর্ষক আর কী হতে পারে? হরর মুভির অনেক রকম ঘরানা আছে, আমরা প্রত্যেকটি ঘরানা বা Genre থেকে সেরা কিছু মুভির তালিকা করেছি। চলুন দেখে নেওয়া যাক এমনই পাঁচটি জমজমাট হরর মুভির তালিকা, যেগুলো আপনার ছুটির সময়টুকু করে রাখবে স্মরণীয়।

১. দ্য শাইনিং (১৯৮০)

শুরুতেই আসি Psychological Horror Genre-তে। এই জনরাতে নির্দ্বিধায় এই মুভিটি ইতিহাসের বুকে অমর হয়ে থাকবে। স্টিফেন কিংয়ের লেখা অবলম্বনে সর্বকালের অন্যতম সেরা পরিচালক স্ট্যানলি কুবরিকের এক অনন্য সৃষ্টি এই মুভিটি

কাহিনী সংক্ষেপঃ শীতকাল, প্রচণ্ড তুষারপাতে চারদিক থেকে বিচ্ছিন্ন এক নগর। কলোরাডোর মাঝে শীতের প্রকোপে জনমানবশূন্য বিশাল রাজপ্রাসাদের মতো দাঁড়িয়ে আছে হোটেল ওভারলুক। জ্যাক টরেন্স (জ্যাক নিকলসন) একজন লেখক, নির্জনতা লেখালেখির কাজে সাহায্য করবে ভেবে তিনি দায়িত্ব নিলেন এই হোটেলের কেয়ারটেকার হিসেবে। স্ত্রী আর শিশুপুত্রকে নিয়ে যখন উঠলেন এই হোটেলে, ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেন নি কী দুঃসহ জান্তব অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করে আছে তাদের সামনে।

The Shining হরর মুভির জগতে কালজয়ী একটি নাম হয়ে থাকবে চিরদিন। জ্যাক নিকলসনের অনবদ্য অভিনয় এবং স্ট্যানলি কুবরিকের পরিচালনা এই মুভিটিকে করে তুলেছে অনন্য। মুভিটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একদম আঠার মতো গেঁথে রাখবে আপনাকে, বাজি ধরে বলতে পারি রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় লাইট নেভানোর সাহস হবে না আদৌ! যমজ বোনের রহস্য, REDRUM কেন লিখে রেখেছে দেয়ালে, জনমানবশূন্য হোটেলে মানুষের কলরব করছে কারা, এলিভেটরে রক্তের ঢেউ কোত্থেকে এলো, ‘Shining’ বলতেই বা কী বোঝায়? এগুলো জানতে অবশ্যই দেখে ফেলুন এই মুভিটি।

২. দ্য টেক্সাস চেইনস ম্যাসাকার (১৯৭৪)

এবার চলুন ঢুঁ মেরে আসা যাক Indie Horror Genre-তে। কোনো বড় প্রোডাকশান হাউজের বাঁধাধরা চাহিদা মেনে নয়, একদম স্বাধীনভাবে পরিচালকের নিজের ইচ্ছেমতো বানানো এমন অনেক ইন্ডি হরর মুভি মুক্তি পাচ্ছে হাজারে হাজারে। কিন্তু একটি মুভি সবার দুঃস্বপ্নের কারণ হয়ে থাকবে বহুদিন।

আপনি যদি এমন কোনো মুভি দেখতে চান যেটা আপনার ঘুমে দুঃস্বপ্ন হয়ে হানা দেবে চিরদিন, তবে সাহস করে দেখে ফেলুন এই মুভিটি। এই মুভিটির ট্যাগলাইন হচ্ছে- “Who will survive & what will be left of them?

যদিও কথাটি মুভির চরিত্রদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, তবে এটি দর্শকদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। আপনার মনে প্রচণ্ড আতঙ্কের সৃষ্টি করবে এই মুভিটি।

কাহিনী সংক্ষেপঃ স্যালি এবং তার হুইল চেয়ারে আবদ্ধ ভাই ফ্রাঙ্কলিন, তিন বন্ধুকে সাথে করে টেক্সাসে যায় তাদের দাদার কবর পরিদর্শনে। যাত্রাপথেই পরিচয় হয় এক আধপাগল লোকের সাথে, সময় যত গড়ায় দুঃস্বপ্ন ততো হানা দিতে থাকে পাঁচ তরুণ-তরুণীর জীবনে।

সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো এই মুভিটি আংশিকভাবে সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার এড গেইন এবং নরখাদক পরিবারের ইতিহাস ভূমিকা রেখেছে এই মুভিটির গল্পে। কবর থেকে গলিত মৃতদেহ খুঁড়ে নিয়ে যায় কারা ওরা? মানুষের হাড়গোড় দিয়ে ঝাড়বাতি, চেয়ার, খাঁচা বানিয়ে রাখে কে? মৃত মানুষের চামড়া দিয়ে বানানো মুখোশ পরা উন্মাদটা কোথা থেকে এলো? সত্যিই কি স্রেফ লাশ চুরি, নাকি ভয়াল নরখাদকদের আড্ডা বসেছে টেক্সাসের ধূলি ধূসরিত মফস্বল এই নগরে?

৩. ড্যাবঃ কার্স অফ দ্য জিন (২০১৩)

মানুষের অন্ধকার পাশবিক দিক নিয়ে তৈরি মুভি নিয়ে আলোচনা অনেক হলো। এবার তবে আসা যাক হরর মুভির অন্যতম জনপ্রিয় ঘরানায়- Paranormal/Supernatural horror genre। এই জনরাতে বেছে নিয়েছি হলিউড থেকে অনেক দূরে, তুরস্কের একটি হরর মুভি! হাল জমানায় বিশ্বজুড়ে মানুষের হাড়কাঁপানো Dabbeসিরিজের চতুর্থ কিস্তি এই মুভিটি।

অশরীরী অস্তিত্বের কথা আমরা সবাই শুনেছি। ‘জ্বিন’, ‘ভূত’ যেভাবেই একে আখ্যায়িত করা হোক না কেন, মানুষের চেনা জগতের বাইরে অন্য ভুবনের এই বাসিন্দাদের নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। Dabbe 4 বা Dabbe: Curse of the Jinn আপনাকে আবারও মনে করিয়ে দিবে এই একবিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীর অনেক জায়গা কী ভীষণভাবে কুসংস্কারাচ্ছন্ন। কিন্তু শুধুই কি কুসংস্কার? নাকি সত্যিই অদেখা জগতের কারো অস্তিত্ব রয়েছে আমাদের এ চেনা ভুবনে?

কাহিনী সংক্ষেপঃ সুন্দরী, গুণবতী, সবার স্নেহের ভালবাসার কুবরা বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে ভালবাসার মানুষটির সাথে। সবকিছু যাচ্ছিল প্রত্যাশামাফিক, হঠাৎ এক অশুভ শক্তিবলে বিয়ের আসর পরিণত হলো শোক ও আতঙ্কের তাণ্ডবে। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিকমনস্ক তরুণী ইব্রু, যে কিনা পেশায় একজন সাইকিয়াট্রিস্ট, ছোটবেলার বন্ধু কুবরাকে সুস্থ করার জন্য ছুটে এলো তাদের গ্রামে। সাথে এক তরুণ ওঝা, ফারুক তার নাম। কী যে এক মহাবিপর্যয়ের কবলে তারা পড়তে যাচ্ছে সেটা কল্পনাও করতে পারেনি।

Dabbe 4 মুভিটি ধারণ করা হয়েছে Found Footage স্টাইলে। অর্থাৎ আপনার দেখে মনে হবে এটি কোনো মুভি নয়, বরং বাস্তবেই সংঘটিত হওয়া কোনো কাহিনী। বলে রাখা ভাল, মুভির নির্মাতাদের দাবী অনুযায়ী এ মুভিটি নির্মিত হয়েছে সত্য ঘটনা অবলম্বনে!
মুভিতে প্রতিটি চরিত্রের অভিনয় এত সাবলীল এবং বিশ্বাসযোগ্য যে আপনার মাথায়ই আসবে না এটি যে একটি মুভি। গল্পের ভেতর আপনি একদম ডুবে যাবেন, মনে হবে ইব্রু, ফারুক, কুবরা এবং অভিশপ্ত সেই গ্রামে আপনি নিজেই সেই পৈশাচিক রাতে অবস্থান করছেন। দুর্বলচিত্তের মানুষদের জন্য এই মুভিটি দেখা একদম বারণ। মুভিটিতে এমন কিছু দৃশ্য আছে সহ্য করতে পারবেন না।

ফারুক ওঝা জ্বিন তাড়ানোকে জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছে, তার এ কর্মকাণ্ড সবই কি ভণ্ডামি, নাকি আসলেই সত্যি? বিজ্ঞানমনস্ক ইব্রু সবকিছুকে বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করতে চায়। কিন্তু সত্যিই কি সে পেরেছে বিজ্ঞান আর অপবিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি পেতে? অভিশপ্ত গ্রাম কেন বিরান হয়ে গেল? গ্রামের বাসিন্দারা সবাই কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছে? পৈশাচিক অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোরই বা ব্যাখ্যা কি?

৪. দ্য অরফানেজ (২০০৭)

প্রিয় পাঠক, চলুন এবার ঘুরে আসা যাক Atmospheric Horror Genre থেকে। এবার তুরস্ক থেকে নিয়ে যাবো আপনাদের স্পেনে, অপূর্ব সুন্দর এবং ভয়াল একটি মুভির খোঁজে।

The Orphanage একইসাথে দারুণ ভয়ের এবং অসম্ভব সুন্দর একটি মুভি। চারপাশের পরিবেশকে ব্যবহার করে এত সুনিপুণভাবে ভয়ের আবহ তৈরি করা হয়েছে যে আপনি প্রতিটি দরজার আঘাতে, সমুদ্র তীরের বাতাসের হুতাশে, ঘরের কোণে প্রতিটি অস্ফুট ফিসফিস শব্দে থেকে থেকে চমকে উঠবেন।

কাহিনী সংক্ষেপঃ সমুদ্র তীরের ধারে একটি বিশাল পরিত্যক্ত অনাথাশ্রম। শৈশবে সেখানে বেড়ে ওঠা লরা বিয়ের পর স্বামী কার্লোস এবং সাত বছরের দত্তক সন্তান সিমোনকে নিয়ে উঠে সেই অনাথাশ্রমে। নতুন করে সেটি বিকলাঙ্গ শিশুদের জন্য খুলতে চায় সে। পুরনো এই দালানের প্রতিটি ধুলোবালিতে মিশে আছে কতো অজানা গল্প, কতো মানুষের হাহাকার। শিশু সিমোনের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এক অদৃশ্য শিশুর সাথে, থমাস তার নাম। সে কি কেবলই সিমোনের কল্পনা? নাকি থমাসও রহস্যে ঘেরা এ অনাথাশ্রমের ইতিহাসের আরেক সংযোজন?

মুভিটি যেমন রহস্যময়, তেমনি ভয়াল, কিন্তু সর্বোপরি অসম্ভব বেদনাবিধুর একটি গল্প জড়িয়ে আছে এর সাথে। মুভির শেষে চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না। পুরো মুভি জুড়ে নানা প্রশ্ন জাগিয়ে তুলবে আপনার উৎকণ্ঠা, মিথ্যা পরিচয়ে সিমোনকে কৌশলে তুলে নিতে চাওয়া বৃদ্ধা মহিলাটি কে? বন্ধ ঘরের রহস্য কী? কার পায়চারির আওয়াজ পাওয়া যায় শূন্য ঘরে? সমুদ্রতীরে পরিত্যক্ত লাইট হাউজ, সেটি কি সত্যিই মনের আশা পূরণ করতে পারে? গুহার ভেতর উদ্ভট মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ানো শিশুটি কোথা থেকে এলো? লরা কি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে শোকে-দুঃখে, নাকি সত্যিই অশরীরী কারো হাহাকার বেদনা মিশে আছে রহস্যময় এ অনাথাশ্রমে?

৫. রেক (২০০৭)

অবশেষে যে ঘরানার কথা না বললেই নয় তা হলো Zombie Horror Genre! ষাটের দশকের শেষ থেকে পৃথিবীজুড়ে জনপ্রিয় হওয়া এ ঘরানার চাহিদা সর্বত্র। প্রচুর অসাধারণ মুভি তৈরি হয়েছে জীবন্মৃত জোম্বিদের নিয়ে। তারই ভেতর অনন্য একটি মুভি দিয়ে শেষ করছি লেখা।

স্প্যানিশ ভাষায় তৈরি এ মুভিটি মুক্তির পর থেকেই জোম্বি মুভির ঘরানায় আলাদা কদর পেয়ে এসেছে সবসময়। অতিপ্রাকৃত আর বাস্তবতার মিশেল আপনাকে একটানে তুলে নিয়ে যাবে এমন এক বিভীষিকাময় দুনিয়ায়, যেখান থেকে মুক্তি পাওয়া দায়।

কাহিনী সংক্ষেপঃ তরুণী সাংবাদিক এঞ্জেলা ভিদাল এবং তার ক্যামেরাম্যান পাবলো এসেছে দমকলকর্মীদের কার্যালয়ে, তাদের নৈশজীবন, ট্রেনিং কীভাবে কাটে সেগুলো নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করতে। হাসি-আনন্দমুখর পরিবেশে হঠাৎ একটি ফোনকল বদলে দিল গোটা পরিবেশ, দমকলকর্মীদের সাথে এঞ্জেলা ও পাবলো ছুটলো এক বাড়িতে, সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে রক্তাক্ত নারকীয় এক দুঃস্বপ্ন।

REC পুরো মুভিটিই POV স্টাইলে ধারণ করা, অর্থাৎ পাবলোর ক্যামেরাতেই উঠে এসেছে মূলত গোটা কাহিনী। সেই রহস্যময় বাড়িটিতে ঢোকার পর থেকেই যে বিভীষিকার শুরু, টানটান উত্তেজনায় আপনার শ্বাসরুদ্ধ করে রাখবে গোটা মুভি। বদ্ধ জায়গায় আটকে পড়ার আতঙ্ক, দিশেহারা মানুষের স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলা, ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো পৈশাচিক মৃত্যুর অপেক্ষা- আপনি তাদের অনুভূতিগুলো একদম প্রত্যক্ষদর্শীর মতো অনুভব করতে পারবেন। কী ছিল সেই রহস্যময় গবেষণায়? কেন হচ্ছে এই নারকীয় তাণ্ডব? বাইরে থেকে কেন ঘিরে রেখেছে সেনাবাহিনী? পালানোর কি কোনো উপায় নেই? দমবন্ধ উত্তেজনা অনুভব করতে দেখে ফেলুন এ মুভিটি, একবার দেখলে জীবনেও ভুলতে পারবেন না সে অভিজ্ঞতা। তথ্যসূত্রঃroar.media